মহাবিশ্বের ১০টি বৃহত্তম নক্ষত্র
সূর্যের চেয়েও কত গুণ বড় এই মহাজাগতিক দানবরা?
আমাদের এই সুবিশাল মহাবিশ্বে নক্ষত্রের সংখ্যা অগণিত। রাতের আকাশে যে তারাগুলোকে ক্ষুদ্র আলোর বিন্দুর মতো দেখায়, সেগুলোর অনেকগুলোই আসলে আমাদের সূর্যের চেয়ে বহুগুণ বড়!
আমাদের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র সূর্য নিজেই এক বিশাল অগ্নিপিণ্ড। এর ভেতরে আয়তনের হিসাবে প্রায় ১৩ লাখ পৃথিবী স্থান পেতে পারে। সূর্যের ব্যাস প্রায় ১৪ লাখ কিলোমিটার। কিন্তু মহাবিশ্বে এমন কিছু নক্ষত্র রয়েছে, যেগুলোর ব্যাসার্ধ সূর্যের তুলনায় এক হাজার থেকে প্রায় দুই হাজার গুণ পর্যন্ত হতে পারে!
বিবিসি সায়েন্স ফোকাস-এ প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে মহাবিশ্বের বৃহত্তম নক্ষত্রগুলোর একটি তালিকা নিয়ে আলোচনা করা যাক। চলুন, ১ থেকে ১০ পর্যন্ত ক্রমানুসারে জেনে নিই এমনই ১০টি বিস্ময়কর নক্ষত্র সম্পর্কে।
১. ইউওয়াই স্কুটি (UY Scuti) — এক মহাবিশাল নক্ষত্র
তালিকার শীর্ষে রয়েছে ইউওয়াই স্কুটি (UY Scuti), যা দীর্ঘদিন ধরে মহাবিশ্বের বৃহত্তম পরিচিত নক্ষত্রগুলোর একটি হিসেবে আলোচিত হয়ে আসছে।
কিছু পুরোনো অনুমানে এর ব্যাসার্ধ সূর্যের তুলনায় প্রায় ১,৭০৮ গুণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সে হিসাবে এর ব্যাসার্ধ প্রায় ১২০ কোটি কিলোমিটারের কাছাকাছি হতে পারে। তবে নক্ষত্রটির প্রকৃত আকার নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে, এবং আধুনিক পর্যবেক্ষণে এর আকারের হিসাব পুনর্মূল্যায়ন করা হয়েছে।
UY Scuti অবস্থিত স্কুটাম নক্ষত্রমণ্ডলে, পৃথিবী থেকে কয়েক হাজার আলোকবর্ষ দূরে। এটি একটি লাল অতিদানব নক্ষত্র। এর পৃষ্ঠের তাপমাত্রা সূর্যের তুলনায় কম, যা এ ধরনের বিবর্তিত নক্ষত্রের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য।
২. ডব্লিউওএইচ জি৬৪ (WOH G64)
মহাবিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত লাল অতিদানব নক্ষত্র হলো WOH G64। এটি লার্জ ম্যাজেলানিক ক্লাউডে অবস্থিত, যা আমাদের মিল্কিওয়ে ছায়াপথের কাছাকাছি একটি উপগ্রহ ছায়াপথ।
কিছু হিসাব অনুযায়ী, এর ব্যাসার্ধ সূর্যের তুলনায় প্রায় ১,৫৪০ গুণ পর্যন্ত হতে পারে। এর চারপাশে প্রচুর গ্যাস ও ধুলিকণা রয়েছে, যা নক্ষত্রটিকে ঘিরে একটি ঘন আবরণ তৈরি করেছে।
এই নক্ষত্রটি বিজ্ঞানীদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এর পর্যবেক্ষণ থেকে বিশাল নক্ষত্রের জীবনচক্র ও শেষ পর্যায়ের বিবর্তন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
৩. আরএসজি-ভি৮-এফজিসি০১ (RSG-V8-FGC01)
তালিকার তৃতীয় স্থানে রয়েছে এই বিশাল নক্ষত্রটি। এর আনুমানিক ব্যাসার্ধ সূর্যের প্রায় ১,৫৩০ গুণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
কল্পনা করুন, এমন একটি নক্ষত্রকে যদি আমাদের সৌরজগতের কেন্দ্রে বসানো হতো, তাহলে এর বাইরের স্তর বৃহস্পতির কক্ষপথের কাছাকাছি পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারত! অবশ্য প্রকৃত অবস্থান নির্ভর করবে নক্ষত্রটির সঠিক আকারের ওপর।
৪. ডব্লিউএইচ ৫১৭০ (WH 5170)
তালিকার চতুর্থ স্থানে রয়েছে WH 5170 নামে উল্লেখ করা নক্ষত্রটি। এর আকার সূর্যের তুলনায় আনুমানিক ১,৪৬১ গুণ বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে এই নক্ষত্রের নাম ও শ্রেণিবিন্যাস সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক উৎস থেকে যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ, বৃহত্তম নক্ষত্রের তালিকায় বিভিন্ন গবেষণায় ভিন্ন নাম ও আকারের হিসাব দেখা যায়।
৫. এইচডি ২৬৯৫৫১ (HD 269551)
তালিকার পঞ্চম স্থানে রয়েছে এইচডি ২৬৯৫৫১। এর ব্যাসার্ধ সূর্যের তুলনায় আনুমানিক ১,৪৩৯ গুণ।
এই নক্ষত্রটিও বিশাল আকারের বিবর্তিত নক্ষত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম। এ ধরনের নক্ষত্রের জ্বালানি ফুরিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে তাদের বাইরের স্তর প্রসারিত হয় এবং তারা বিশাল লাল নক্ষত্রে পরিণত হতে পারে।
৬. ভিওয়াই ক্যানিস মেজরিস (VY Canis Majoris)
ভিওয়াই ক্যানিস মেজরিস মহাবিশ্বের অন্যতম পরিচিত লাল অতিদানব নক্ষত্র। এর ব্যাসার্ধ সূর্যের প্রায় ১,৪২৯ গুণ বলে বিভিন্ন অনুমানে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর বিশালত্ব কল্পনা করতে একটি তুলনা করা যায়। নক্ষত্রটির চারপাশে আলোর গতিতে একবার ঘুরে আসতে প্রায় ছয় ঘণ্টা লাগতে পারে। অথচ একই গতিতে সূর্যের চারপাশে একবার ঘুরে আসতে সময় লাগবে মাত্র কয়েক সেকেন্ড!
এই তুলনা থেকেই বোঝা যায়, মহাবিশ্বের কিছু নক্ষত্রের আকার আমাদের পরিচিত ধারণার কতটা বাইরে।
৭. এইচডি ১১২৪৬৩ (HD 112463)
এই নক্ষত্রটি অবস্থিত লার্জ ম্যাজেলানিক ক্লাউডে, যা আমাদের মিল্কিওয়ে ছায়াপথের কাছাকাছি একটি উপগ্রহ ছায়াপথ।
এর ব্যাসার্ধ সূর্যের তুলনায় আনুমানিক ১,৪২০ গুণ। পৃথিবী থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১ লাখ ৬৩ হাজার আলোকবর্ষ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এত দূরের নক্ষত্রের আকার ও বৈশিষ্ট্য নির্ণয় করতে বিজ্ঞানীদের উন্নত পর্যবেক্ষণপদ্ধতির সাহায্য নিতে হয়।
৮. সিএম ভেলোরাম (CM Velorum)
ভেলা নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত সিএম ভেলোরামও একটি বিশাল লাল নক্ষত্র। এর ব্যাসার্ধ সূর্যের তুলনায় আনুমানিক ১,৪১৬ গুণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
পৃথিবী থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১৫ হাজার আলোকবর্ষ। এত দূরে অবস্থান করার কারণে একে পর্যবেক্ষণ করতে জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক যন্ত্রের প্রয়োজন হয়।
৯. এএইচ স্করপি (AH Scorpii)
স্করপিয়াস নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত এএইচ স্করপি একটি লাল অতিদানব নক্ষত্র। এর আনুমানিক ব্যাসার্ধ সূর্যের প্রায় ১,৪১১ গুণ।
বিশাল আকারের হলেও এর পৃষ্ঠের তাপমাত্রা সূর্যের তুলনায় অনেক কম। এর পৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রায় ৩,৪০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যেখানে সূর্যের দৃশ্যমান পৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রায় ৫,৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
১০. এইচভি ২১১২ (HV 2112)
তালিকার দশম স্থানে রয়েছে এই বিশাল নক্ষত্রটি। এর আনুমানিক ব্যাসার্ধ সূর্যের ব্যাসার্ধের প্রায় ১,৩৭৪ গুণ।
এটি সূর্যের তুলনায় কয়েক লাখ গুণ বেশি উজ্জ্বল হতে পারে বলে বিভিন্ন অনুমানে উল্লেখ করা হয়েছে। নক্ষত্রটির প্রকৃতি ও বিবর্তনের শেষ পর্যায় নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ রয়েছে।
মহাবিশ্বের বিশালত্ব আমাদের কী শেখায়?
মহাবিশ্বের বিশাল নক্ষত্রগুলোর কথা জানলে আমাদের সামনে এক বিস্ময়কর বাস্তবতা উন্মোচিত হয়। যে সূর্যকে আমরা পৃথিবীর জীবনধারণের প্রধান শক্তির উৎস হিসেবে জানি, সেটিও মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় নক্ষত্রগুলোর তুলনায় অনেক ছোট।
আবার আকারে বিশাল নক্ষত্র মানেই যে সেটি সবচেয়ে ভারী বা সবচেয়ে উজ্জ্বল, তা-ও নয়। নক্ষত্রের আকার, ভর, তাপমাত্রা ও উজ্জ্বলতা একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও এগুলো ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য।
বিজ্ঞানীরা যত উন্নত টেলিস্কোপ ও পর্যবেক্ষণপ্রযুক্তি ব্যবহার করছেন, ততই মহাবিশ্বের নতুন নতুন রহস্য উন্মোচিত হচ্ছে। আজ যাকে বৃহত্তম বলে মনে করা হচ্ছে, ভবিষ্যতের গবেষণায় তার চেয়েও বড় কোনো নক্ষত্রের সন্ধান পাওয়া অসম্ভব নয়।
মহাবিশ্বের এই অসীম বিস্তৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আমরা এক বিশাল সৃষ্টিজগতের ক্ষুদ্র একটি অংশে বসবাস করছি, যার অনেক কিছুই এখনো আমাদের অজানা।
তথ্যসূত্র: বিবিসি সায়েন্স ফোকাস এবং বৃহৎ নক্ষত্রবিষয়ক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গবেষণা।

Comments
Post a Comment